নৈশ অপেরা।। শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।
সুপ্রকাশ প্রকাশিত শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের উপন্যাস 'নৈশ অপেরা' পড়ে মতামত জানিয়েছেন টুম্পা বিশ্বাস। আমরা তাঁর অনুমতি নিয়ে নিজেদের টাইমলাইন থেকে শেয়ার করছি।
.........................................................
#পাঠানুভূতি
বই : নৈশ অপেরা
লেখক : শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য
প্রকাশক : সুপ্রকাশ
মুদ্রিত মূল্য : ৫৪০ টাকা
...............................................
কিছু বইয়ের পাঠ এমন অতলস্পর্শ অনুভব দেয়, যে তা নিয়ে কিছু লিখতে গেলে থমকাতে হয়। আসলে শেষ মৃত পাখি পড়ে আমার মুগ্ধতার জন্ম, তারপর বীরেশ্বর সামন্তর হত্যা রহস্য এবং এখন নৈশ অপেরা। আমার পড়া লেখকের এটি তৃতীয় বই।
এই কাহিনি, কাহিনি থেকে যায় না। অনুভূতি নিঙড়ে তুলে আনা কিছু শব্দ ছবি আঁকে। একটা প্রায় জনবিরল স্থানের বর্ণনা লেখক এভাবে দেন।
"বিকেলের মরা আলো যেন দেশি কইয়ের পেটের মতো হলুদ" অথবা লেখেন, "পশুদের খুরের আঘাতে ধুলোময় সূর্যাস্ত দেখে আমার মনে হয় তাদের এই মেলাংকলিক যাত্রার গন্তব্য বুঝি কোনো সমাধিস্থলই হবে।"
এই বিষাদের রং গাঢ়, তাতে ভাষার গাঢ়তর অবসাদ। কবিতা আর গদ্যের মাঝখানে যে ব্যবধান চিরকাল ছিল বলে জেনেছি, তা অবলীলায় লেখক পার করে দেন বারবার।
কাহিনির দিকে মুখ ফেরালে বলতে হয় এটা একটা রেবেকা কেস অর্থাৎ অমীমাংসিত রহস্য দিয়ে শুরু। তার সূত্র ধরে কথকের অতীতে ফিরে যাওয়া, এমন শহরে ফিরে যাওয়া যেখানে কে মৃত আর কে মৃতপ্রায়, তার তফাৎ করা মুশকিল। ইতিহাসের গায়ে লেগে যায় ফোকলোরের ক্লান্তি।
জঙ্গলাবৃত এক ভাঙাচোরা চার্চ, জোহার হালের হাওয়ায় মিশে থাকা দীর্ঘশ্বাস, দিনে-রাতে পথে হেঁটে যাওয়া মৃত কিশোরীর আত্মা- সব মিলে মিস্টিক আবহাওয়া। শেষ অবধি কিন্তু সবেরই একটা লৌকিক ব্যাখ্যা মেলে। অথচ সেই ব্যাখ্যাটাই সব নয়। ধরুন এক শিশু সবে বর্ণ চিনতে শিখছে, সে জানে না ওইসব বর্ণের আড়ালে কত কঠিন শব্দের বসবাস, হয়ত পরবর্তী জীবনে তাকে সেসব শব্দের বেত্রাঘাতে জর্জরিত হতে হবে। ব্যাপারটা হল, সে না চিনলেও শব্দগুলো আছে, একদিন প্রকাশিতও হবে। তার আগের অপেক্ষাটুকুই আসলে রহস্য সমাধানের প্রসেস।
শেষ মৃত পাখিতে তনয়া ভট্টাচার্যের সাথে পরিচয় হয়। সেখানে ছিল শৈল শহর, অখ্যাত কবির রহস্য-মৃত্যু। এখানে আছে তিরিশ বছর বা তারও বেশি আগে হওয়া শিশুর অন্তর্ধান, কিশোরীর পলায়ন, হাতির দাঁতের চিরুনি, চিঠি আর ছেঁড়া চুলের গোছা। অথবা এসব আদতে কিছু নেই। আছে অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের সমাজের মূল স্রোতে মিশতে না পারা বা না চাওয়ার যন্ত্রণা।
লেখক কখনও একস্রোতে ন্যারেটিভ দেন না। কথক কখনও বারবারা, কখনও তনয়া, কখনও অবিনাশ। একবার সময় এগিয়ে চলে, একবার পিছিয়ে যায়। পাঠক খেই হারাতে পারেন। তবে তাঁরা ভেসে, ডুবে, শেষ অবধি সমাধান পাবেন।
আমি লেখকের লেখার বিশেষ ভক্ত। এটি আমার পড়া তাঁর তৃতীয় বই। ইচ্ছে আছে বাকী বইগুলোও সংগ্রহে রাখব। এই সময়ের একজন বলিষ্ঠ কলম তিনি।
পাঠক, আপনার যদি অবসাদের ভয় থাকে, তবে এই বই আপনার জন্য নয়। এখানে রহস্য সমাধান নয়, সমাধানের সেই পৌনঃপুনিক চেষ্টার ব্যর্থতাই মূল কথা। জীবনের মতোই, সমাধানের পিছনে অন্ধ দৌড়, আদতে অর্থহীন। একটা অতলান্তিক ভাঙচুর সকলের মুখ্য নিয়তি।
Comments
Post a Comment