Posts

এক যে ছিল গ্রাম। সেকালের পাউস

Image
আমাদের গাঁকে ঘিরে কিছুটা অঞ্চল উর্বর এঁটেল মাটির হলেও তার থেকে দু - চার কিলোমিটার এগিয়ে বা পিছিয়ে গেলেই ল্যাটেরাইট মাটির রুখাশুখা বিস্তীর্ণ অঞ্চল । সেখানে শাল আর ইউক্যালিপটাসের জঙ্গল । সেইসব জঙ্গল - ঘেঁষা গাঁগুলোতে জলের খুব অভাব । পুকুর - ডোবা যে নেই তা নয় , তবে গ্রীষ্মে তার বেশির ভাগই শুকিয়ে খটখটে । দু - একটা পুরনো গভীর পুকুর অবশ্য আছে । সেগুলোতে খানিক জল থাকে । সেই জলে মাছও থাকে । রুই - কাতলা , ট্যাংরা - পুঁটি । বর্ষার নতুন জল লালমাটিতে মাখামাখি হয়ে সেই সব পুকুরে যখন তোড়ে নামতে থাকে মাছগুলো তখন পাগলা হয়ে যায় । তিন - চার ঘণ্টা ধরে চলতে থাকে তাদের মিলন - উৎসব । উৎসব - শেষে থিক্ ‌ থিকে জেলির মতো ডিম ভাসতে থাকে জলের উপরিভাগে । তখন যে যার মতো জাল , ন্যাকড়া ইত্যাদি নিয়ে পুকুরে নেমে পড়ে সেই ডিম ছেঁকে তুলতে । উৎসাহের আনাড়িপনায় বেশির ভাগ ডিমই নষ্ট হয় । ছোট ছোট গর্ত খুঁড়ে সেই সব চাবায় ঢেলে রাখা ডিম থেকে সামান্য যা পোনা জন্মায় , স্থানীয় পুকুর - মালিকরাই তা দু - পাঁচ টাকায় কিনে নেয় । এই করতে করতেই কোনো এক বছরে কোনো এক পুকুর - মালিকের মনে হল , এই বাৎসরিক ব্যাপারটাকে বারোয়ারি হাতে ছে...

এক যে ছিল গ্রাম। একের মধ্যে তিন

Image
তার নাম , ধরে নেওয়া যাক , অমৃত । কাছাকাছি বয়সের খোকন ও অমৃত একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের প্রথম ধাপগুলি একই চালে ঘষটাতে ঘষটাতে এগিয়ে চলছিল । তখন পর্যন্ত তাদের দুজনের মধ্যে পার্থক্য বলতে খোকন যখন তালগাছের মাথায় উঠে কচি শাঁসওলা তালের কাঁদি কেটে নীচে ফেলছে , অমৃত তখন গাছের তলায় দাঁড়িয়ে সেগুলো গুছিয়ে রাখছে । তবে আমার স্মৃতিতে অমৃতর অন্য একটা ছবিও অস্পষ্ট ভাসে । আমি তখন নেহাতই ছোটো , ফুটবলে লাথি মারার মতো পায়ের জোর হয়নি । গ্রামেরই এক পোড়ো জমিতে এক ফুটবল - ম্যাচ আমাদের গ্রাম বনাম পাশের গ্রাম । একটি মাত্র গাঁ থেকে এগারো জন খেলুড়ে জোটানো মুশকিল । মাঠও ছোটো । তাই সাত জনের দল । খোকনের নেতৃত্বে আমাদের দলে অনিচ্ছুক অমৃতকে নিতে হয়েছে । আমি দর্শক । দেখছি অমৃত মাঠের ডান প্রান্তে সাইডলাইনের কাছে সারাটা সময় দাঁড়িয়েই আছে । তাকে কেউ বল দিচ্ছে না , অন্যদের মতো ছোটাছুটি করে বল নেওয়ার আগ্রহও তার মধ্যে দেখা যাচ্ছে না । খেলা যখন প্রায় শেষের মুখে তখন আচমকা বিপক্ষের পায়ে লেগে বল চলে এল অমৃতর পায়ে । তাকে কেউ হিসেবের মধ্যে ধরেনি । তখন অমৃতর সামনে কেবলমাত্র বিপক্ষের লেফট ব্যাক । বল পায়ে চোঁ চোঁ দৌড় লাগাল অ...

এক যে চিল গ্রাম। ইঁদুর সংসর্গের কথামালা

Image
অজ গাঁয়ের প্রচুর ডালপালা-মেলা এক একান্ন চাষি পরিবারে জন্মেছিলাম। সেখানে বড়োরা ছোটোদের জগতে বিশেষ নাক গলাতেন না। ছোটোরাও জ্ঞান হতে না হতেই স্বনির্ভর হয়ে যেত। বড় এবং ছোট – এই দুই মনুষ্য প্রজাতির সঙ্গে মূল বাড়ির ভেতরে অনেক বেশি সংখ্যায় বাস করত ইঁদুর। ছড়ানো-ছিটানো মাটির বাড়ি, মূল বাড়ির আড়াই ফুট চওড়া দেওয়ালে দু-রকম প্রজাতির ইঁদুর মোটামুটি নিরুপদ্রবেই তাদের সংসার নির্বাহ করত। ধেড়ে এবং নেংটি। বাড়ির মেয়েরাই কেবল নেংটিদের কেন যে চুটে উঁদুর বলতেন সেটা আজও আমার কাছে রহস্য। ধেড়েরা ধান-চাল খাওয়া বাদে অন্য কোনোরকম দুষ্টুমির মধ্যে যেত না। কিন্তু নেংটিরা জামাকাপড়, বিছানা-বালিশ, কাগজপত্তর, ব্যাগ-বস্তা, এমনকি ঘুমন্ত মেয়েদের লম্বা চুলেও তাদের দাঁতের ধার পরখ করতে ছাড়ত না। বড়োরা ব্যতিব্যস্ত হয়ে মাঝে মাঝে তাদের দমন করার চেষ্টা করতেন। কিন্তু জাঁতিকল বাদে অন্য কোনো অস্ত্রের কথা তাঁদের মাথায় আসত না। বিষ  খুব সহজলভ্যই ছিল, কিন্তু বিষ-মেশানো খাবার ইঁদুর মুখে দেওয়ার আগেই যে খুদে মনুষ্যদের কেউ না কেউ তার স্বাদ নেবেই সে ব্যাপারে তাঁরা অতি-নিশ্চিত ছিলেন। জাঁতিকলে প্রথম প্রথম দু-একটা ধেড়ে ধরা পড়ত ঠিকই; কিন্তু অবি...

এক যে ছিল গ্রাম। আমার বাল্যবন্ধু

Image
আমার এক বাল্যবন্ধুর কথা । পদমর্যাদায় সে কালীকাড়ারই সমান , কেবল উচ্চতায় খাটো । গায়ের রঙও তার কালীরই মতো , নামেও বিশেষ পার্থক্য নেই । সে কেলো । সে ছিল আমারই সমবয়সি , কিন্তু আমি নিতান্ত বালক হলেও সে তখন ভরপুর যুবক । কেলোর লেজটি ছিল কাটা । কীভাবে তার লেজ কাটা পড়েছিল জানি না । তবে অনুমান করা যায় যে আমার কোনো লড়াইবাজ দাদাই কেলোর ছেলেবেলায় তার লেজটি কেটে দিয়েছিলেন । তখন গেঁয়ো লোকদের ধারণা ছিল যে কুকুরের লেজ কেটে দিলে সে ভয়ানক তেজি হয়ে ওঠে । এইসব লেজকাটা কুকুরদের ‘ বেড়ে ’ নামে অভিহিত করা হত । রবি ঠাকুর তাঁর এক কবিতায় একটি ‘ লেজকাটা ভক্ত কুকুর ’- এর কথা বলেছেন । আমাদের গাঁয়ের বেড়েদের যে খুব ভক্তি ছিল , তেমন প্রমাণ অবশ্যি বড় একটা পাইনি । ভিন গাঁয়ের কুকুরদের সঙ্গে লড়াইয়ে তাদের তেজ ঠিক কতখানি ফুটে উঠত , সেটাও বুঝে উঠতে পারিনি । তবে কেলোর কথা আলাদা । সে ছিল এক অসাধারণ কুকুর । আর তার সঙ্গে ছিল আমার গলায় গলায় ভাব । আমার সমস্ত খাবার আমি তার সঙ্গে ভাগ করে খেতাম । কুল , খেজুর কিংবা পেয়ারাটা সে বেচারি খেতে পারত না । সেটা আমি মেনেই নিয়েছিলাম , কিছু মনে করতাম না । খালপাড়ে বুড়ো তেঁতুল ...