অনন্যবর্তী।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

সুপ্রকাশ প্রকাশিত দুর্লভ সূত্রধরের উপন্যাস 'অনন্যবর্তী' পড়ে মতামত জানিয়েছেন মনোলীনা সেনগুপ্ত। আমরা তাঁর অনুমতি নিয়ে নিজেদের টাইমলাইন থেকে শেয়ার করছি।
...................................................................
"মানুষ যতই বড়ো হয় তার খুশি হওয়ার ক্ষমতা ততই কমতে থাকে।"

জীবনের যে সময়টাকে আমরা পিছনে ফেলে এসেছি, সেখানে আর একবার ফিরে যাওয়া যায় না কেন! সেই স্কুলফেরত বিকেল, বন্ধুদের সঙ্গে উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরি, নদীর ধারে বসে থাকা, ছোট ছোট আনন্দে বুঁদ হয়ে থাকা, আর বুকের মধ্যে অজস্র স্বপ্ন নিয়ে বড় হয়ে ওঠা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কত কিছুই তো বদলে যায়, অথচ কোথাও যেন সেই ফেলে আসা দিনগুলোর কাছে আমাদের একটা মন পড়ে থাকে। দুর্লভ সূত্রধরের 'অনন্যবর্তী' ঠিক এমনই এক অনুভূতি বারবার ফিরিয়ে আনে। 

কুন্তী নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক মফস্বল, একদল ছেলেমেয়ে, কয়েকটি পরিবার আর তাদের প্রতিদিনের জীবনযাপন। শোভন, তনয়, তরণী, তপেশ, মনোজ, শিবু, কাজু, টুকুদের বড় হয়ে ওঠার গল্পের মধ্যে লেখক এমনভাবে আমাদের জড়িয়ে নেন যে কখন তাদের আনন্দ, অভিমান, দুঃখ, প্রেম কিংবা স্বপ্নের অংশ হয়ে উঠি, বোঝা যায় না। অথচ এদের কারোর জীবনেই তেমন কোনো অসাধারণত্ব নেই। আছে অভাব, পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক অশান্তি, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা, সামাজিক বাধা। আছে প্রথম প্রেমের অস্বস্তি, না বলতে পারা কথার ভার, আবার বন্ধুর বিপদে নিঃশব্দে পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাসও। এই সাধারণ জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তগুলোকেই লেখক এমন মমতায় এঁকেছেন যে তাদের মধ্যে এক আশ্চর্য অসাধারণত্ব খুঁজে পাওয়া যায়।

তবে উপন্যাসটির ব্যাপ্তি কেবল কিশোরবেলার বন্ধুত্ব কিংবা শোভন-টুকুর প্রেমে সীমাবদ্ধ নয়। এই আখ্যানের আরেকটি সমান্তরাল দিক, যেখানে রয়েছেন শচীপ্রসাদ, সতীশচন্দ্র, ফণিভূষণ, নীরদদের মতো মানুষ। বয়সের ভার, সংসারের দায়িত্ব, মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েন, ব্যক্তিগত অপ্রাপ্তি— সবকিছুর মধ্যেও তাদের বন্ধুত্ব ও মানুষের জন্য কিছু করার আকাঙ্ক্ষা বেঁচে থাকে। দুই প্রজন্মের জীবন আলাদা পথে এগোলেও কোথাও একটা অদৃশ্য সেতু তাদের মিলিয়ে দেয়। ছোটরা যেমন নিজেদের পৃথিবী বদলানোর স্বপ্ন দেখে, বড়রাও তেমনই জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে খুঁজে ফেরেন এক বিকল্প বেঁচে থাকার পথ।

এই উপন্যাসে স্বপ্ন মানে কেবল নিজের সাফল্য, প্রতিষ্ঠা কিংবা ব্যক্তিগত প্রাপ্তি নয়। স্বপ্নের পরিধি অনেক বড়। জাতপাত, ধর্ম, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক বিভাজন অতিক্রম করে এমন একটা পৃথিবীর স্বপ্ন, যেখানে মানুষের পরিচয় তার মানবিকতায়। অবনদার নাইট স্কুল থেকে শটিডাঙার যৌথ খামারের পরিকল্পনা— এই সমস্ত প্রচেষ্টার মধ্যে দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন, ভালো পৃথিবীর স্বপ্ন দেখা যতটা সহজ, তাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া ততটাই কঠিন। মতাদর্শের সঙ্গে বাস্তবের সংঘাত আছে, মানুষের দুর্বলতা আছে, ভুল বোঝাবুঝি আছে, স্বপ্নভঙ্গও আছে। তবু সবকিছুর শেষে মানুষের পাশে মানুষ থাকার যে তাগিদ, সেটাই যেন সমস্ত ব্যর্থতার ঊর্ধ্বে থেকে যায়।

শোভনের উড়োজাহাজের স্বপ্নটিও তাই নিছক কল্পনার উড়ান নয়। বয়সের সঙ্গে সেই স্বপ্নের অর্থ বদলায়। একসময় একা উড়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ধীরে ধীরে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে উড়ে যাওয়ার স্বপ্নে পরিণত হয়। ব্যক্তিগত স্বপ্ন থেকে যৌথ স্বপ্নে পৌঁছনোর এই যাত্রাটুকুর মধ্যেই যেন উপন্যাসটির সমস্ত দর্শন লুকিয়ে আছে। মানুষ একা ভালো থাকলেই কি সত্যিই ভালো থাকা হয়? চারপাশের মানুষগুলো যখন অনিশ্চয়তা, অভাব আর বঞ্চনার মধ্যে দিন কাটায়, তখন নিজের প্রাপ্তির আনন্দও কি সম্পূর্ণ হতে পারে? 

দুর্লভ সূত্রধরের লেখা যারা পড়েছেন তারা জানেনই,  সবচেয়ে ভালো লাগার দিক তার অনাড়ম্বর অথচ মায়াময় গদ্য। কোথাও অযথা নাটকীয়তা নেই, বড় বড় ঘটনার চমক নেই। নদীর পাড়, স্কুলের বেঞ্চ, চায়ের দোকান, বিকেলের আড্ডা কিংবা সংসারের ছোটখাটো কথোপকথনের মধ্য দিয়েই তৈরি হয় এক জীবন্ত জনপদ। পার্শ্বচরিত্রগুলিও নিছক গল্পের প্রয়োজন মেটাতে আসেনি; প্রত্যেকের নিজস্ব জীবন, বোধ ও অবস্থান রয়েছে। 

 জীবনের সব সমস্যার সমাধান হয়তো পাওয়া যায় না, সব স্বপ্নও পূরণ হয় না। কিছু সম্পর্ক অসম্পূর্ণ থেকে যায়, কিছু প্রচেষ্টা মাঝপথে থেমে যায়, কিছু আদর্শ বাস্তবের কাছে ধাক্কা খায়। কিন্তু তাই বলে জীবন থেমে থাকে না। মানুষ আবার হাত বাড়ায়, নতুন করে স্বপ্ন দেখে, অন্যের দুঃখে নিজের একটু জায়গা ছেড়ে দেয়। হয়তো এই ছোট ছোট প্রচেষ্টাগুলোর নামই বেঁচে থাকা। বইটা শেষ করার পর শটিডাঙার সেই মানুষগুলোর কাছ থেকে খুব সহজে ফিরে আসতে ইচ্ছে করে না। মনে হয়, কুন্তী নদীর ধারে আরও কিছুক্ষণ বসে থাকি, তাদের কথাবার্তা শুনি, তাদের সঙ্গে এক কাপ চা খাই। যে জীবনে ম্যাজিক নেই, সেই জীবনেই মানুষ যখন পরস্পরের জন্য একটু মায়া, একটু সময়, একটু আশ্রয় হয়ে ওঠে— তখন হয়তো ম্যাজিক ঠিক সেখানেই জন্ম নেয়।

অনন্যবর্তী 
দুর্লভ সূত্রধর 
সুপ্রকাশ  
৩২০ টাকা

Comments

Popular posts from this blog

লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর।। এক বিষাদান্ত পরম্পরা।। অনন্ত জানা।। সুপ্রকাশ।।

পাথারে। সেকালের চিত্র চরিত্র

আমার রবীন্দ্রনাথ, আমাদের। আলাপ বিলাপ। স্বপ্নময় চক্রবর্তী