আহাম্মকের খুদকুড়ো।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।
সুপ্রকাশ প্রকাশিত দুর্লভ সূত্রধরের স্মৃতিগদ্য 'আহাম্মকের খুদকুড়ো' পড়ে গুডরিডস্-এ মতামত জানিয়েছেন সায়ন স্যান্যাল। আমরা নিজেদের টাইমলাইন থেকে শেয়ার করছি।
....................................................
আহাম্মকের খুদকুড়ো— দুর্লভ সূত্রধর
প্রকাশক : সুপ্রকাশ
মুদ্রিত মূল্য : ৩২০ টাকা
.
কিছু কিছু এমন বই থাকে, যা পড়তে পড়তে অন্য কারুর জীবনের গল্পের মধ্যে নিজের ফেলে আসা দিনগুলোকেও খুঁজে পাওয়া যায়। দুর্লভ সূত্রধরের আহাম্মকের খুদকুড়ো তেমনই এক স্মৃতিমেদুর বই। এটি নিছক ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ নয়; বরং একটি সময়, একটি জনপদ, কিছু মানুষ এবং তাদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য ছোট ছোট মুহূর্তের কথামালা।
বইটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর বিষয় নির্বাচনে। শৈশব, স্কুলজীবন, শিক্ষক, বন্ধুবান্ধব, পারিবারিক জীবন, খাবারদাবার, উৎসব, অভাব-অনটন কিংবা চারপাশের চেনা পরিবেশ, লেখক তাঁর স্মৃতির ঝুলি থেকে তুলে এনেছেন জীবনের এমন সব টুকরো, যেগুলো আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ হলেও অনুভবে অসামান্য। যে ঘটনাগুলোকে আমরা দৈনন্দিনতার ভিড়ে অনায়াসে ভুলে যাই, লেখকের কলমে সেগুলোই হয়ে ওঠে সময়ের মূল্যবান দলিল।
লেখকের লেখার একটি বিশেষ গুণ তাঁর সহজ, স্বচ্ছ ও আন্তরিক বর্ণনাভঙ্গি। জীবনের কষ্টকে করুণার প্রদর্শনীতে পরিণত না করে, তিনি সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের মধ্যে আনন্দ, অভাব, মায়া ও বেঁচে থাকার নিজস্ব ছন্দটুকু খুঁজে নেন। ফলে অতীতের দিনগুলোর বর্ণনা পড়তে গিয়ে কোথাও কৃত্রিম নস্টালজিয়ার ভার অনুভূত হয় না; বরং মনে হয়, লেখক যেন পরিচিত কারও পাশে বসে গল্প করছেন।
বইটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো সময় ও পরিবেশের পুনর্নির্মাণ। কয়েক দশক আগের জীবনযাত্রা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক, পাড়াপড়শির সামাজিকতা এবং ছোট ছোট আনন্দের বিবরণ পাঠককে ফিরিয়ে নিয়ে যায় এক ভিন্ন সময়ে। বিশেষত যাঁরা পুরোনো দিনের জীবন ও মানুষের সঙ্গে পরিচিত, তাঁদের কাছে এই স্মৃতিচারণের আবেদন আরও গভীর হতে পারে। আর যাঁরা সেই সময় দেখেননি, তাঁদের কাছেও এটি হয়ে উঠতে পারে একটি হারিয়ে যাওয়া জীবনযাত্রাকে চিনে নেওয়ার জানালা।
বইটির নামটিও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। 'খুদকুড়ো' যেমন সামান্য, ছড়িয়ে থাকা কিছু টুকরোকে মনে করায়, তেমনই মানুষের জীবনও গড়ে ওঠে অসংখ্য ছোট ছোট অভিজ্ঞতার সমষ্টিতে। সব স্মৃতি বড় ঘটনা হয়ে ওঠে না, সব অভিজ্ঞতার পেছনে থাকে না কোনও অসাধারণ কাহিনি। তবু সেই সামান্য মুহূর্তগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে জীবনের গভীরতম অনুভূতি। লেখক যেন সেই অবহেলিত টুকরোগুলোকেই যত্ন করে কুড়িয়ে এনে সাজিয়েছেন পাঠকের সামনে।
তবে যাঁরা টানটান কাহিনি, দ্রুতগতির আখ্যান কিংবা নাটকীয় ঘটনার প্রত্যাশা নিয়ে বই পড়েন, তাঁদের কাছে এই স্মৃতিচারণের ধীর গতি কিছুটা আলাদা মনে হতে পারে। এখানে মূল আকর্ষণ ঘটনার চমক নয়, বরং স্মৃতির ভেতর দিয়ে মানুষ ও সময়কে আবিষ্কার করা। এই বইয়ের স্বাদ পেতে হলে তাই কিছুটা ধীর হয়ে পড়তে হয়।
সব মিলিয়ে, আহাম্মকের খুদকুড়ো এমন একটি বই, যা মনে করিয়ে দেয়— জীবনের মূল্যবান গল্পগুলো সব সময় বড় কোনও ঘটনার মধ্যে লুকিয়ে থাকে না। কখনও সেগুলো থাকে স্কুলের কোনও পুরোনো স্মৃতিতে, কখনও দুপুরের খাবারে, কখনও কোনও শিক্ষকের স্নেহে, আবার কখনও হারিয়ে যাওয়া জনপদের পরিচিত কোনও দৃশ্যে।
এই বইয়ের আসল সম্পদ তার স্মৃতির আন্তরিকতা এবং সামান্যকে অসামান্য করে দেখার ক্ষমতা। অতীতের দিনগুলোর প্রতি যাঁদের টান আছে, যাঁরা মানুষের সাধারণ জীবনের অসাধারণ দিকগুলো খুঁজতে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য বইটি নিঃসন্দেহে পাঠযোগ্য। বইটি শেষ করার পর হয়তো নিজের ফেলে আসা দিনগুলোর দিকেও একবার ফিরে তাকাতে ইচ্ছে করবে।
Comments
Post a Comment