দেয়ালের লেখা : এক অন্তহীন প্রকীর্ণ শিল্পকথা।। অনন্ত জানা।। সুপ্রকাশ।।
বস্তুত শেপার্ড বিগ ব্রাদার চরিত্রটিকে গ্রহণ করেছিলেন জর্জ অরওয়েল [প্রকৃত নাম: এরিক আর্থার ব্লেয়ার (১৯০২-১৯৫০)]-এর 'নাইন্টিন এইটি ফোর' (১৯৪৯/১৯৮৪ সালে পুনর্বার প্রকাশিত) উপন্যাসের ব্যবহৃত 'বিগ ব্রাদার'-এর নাম থেকে। উপন্যাসের শুরুতেই উইনস্টন স্মিথ নামীয় চরিত্রটি 'বিগ ব্রাদার'-এর নজরদারির মুখোমুখি হন। অরওয়েল এপ্রিলের এক উজ্জ্বল ঠাণ্ডা সকালে উইনস্টন স্মিথের সূত্রে বিগ ব্রাদার-এর উপস্থিতির রূপকীয়-বাস্তবতার সঙ্গে পাঠকের এইভাবে পরিচয় করিয়ে দেন: 'হলওয়েতে (ঘরসদৃশ করিডর বা প্যাসেজ- প্রা.) বাঁধাকপি সেদ্ধ এবং পুরোনো ন্যাকড়ার গন্ধ ছিল। প্যাসেজের একপ্রান্তের দেয়ালে ঘরের মাপের সঙ্গে বেমানান বড়ো একটি রঙিন পোস্টার সাঁটানো ছিল। এই পোস্টার জুড়ে এক মিটারেরও বেশি চওড়া একটিমাত্র মুখের ছবি: প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী একটি পুরুষের মুখের চিত্রণ— ঘন কালো গোঁফ, মুখটি রুক্ষ হলেও সুন্দর। সাত তলার ফ্ল্যাটে যাওয়ার জন্য উইনস্টন লিফ্ট পাননি, কেননা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় লিফ্টটি অচল ছিল। ঊনত্রিশ বছর বয়সী উইনস্টন তাঁর ডান গোড়ালির প্রায়-স্থায়ী ভ্যারিকোজ আলসার বা ক্ষত নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, মাঝে মাঝে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। সিঁড়ির প্রতিটি ল্যান্ডিংয়ে, লিফ্টের বিপরীতে বিশাল মুখের পোস্টারটি দেয়াল থেকে তাকিয়েছিল। এটি এমনই এক ছবি, এতটাই কাল্পনিক যে আপনার নড়াচড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিত্রণের পুরুষটির চোখ আপনার উপস্থিতিকে সর্বদা অনুসরণ করে। ছবিতে ক্যাপশন ছিল 'বিগ ব্রাদার ওয়াচিং ইউ'। (ভাবানুবাদ) এই ক্যাপশনই বলে দেয়, এমন এক রাষ্ট্রীয় সমাজে আমাদের অবস্থান, যেখানে কেউ কোথাও স্বাধীন নয়, কারও কোথাও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নেই, গণতন্ত্র বা সুশাসন এখানে বিদ্রূপমাত্র। প্রতিটি ব্যক্তি-নাগরিকের জীবন ও কার্যকলাপে, প্রতিটি গণমাধ্যমে সরকারি নজরদারি বাক্-স্বাধীনতাকে প্রহসনের পরিণত করা এবং নিয়ামক হিসেবে রাষ্ট্রশক্তি ও তাগের আড়কাঠিদের একচ্ছত্র আধিপত্যের পৃথিবীকে এই উপন্যাসে অরওয়েল চিত্রিত করেছেন। আকাশে হেলিকপ্টার উড়ে যায়, নেমে আসে— পুলিশের হেলিকপ্টার মানুষের জানালায় নজর রাখে, থট পুলিশের সতর্ক দৃষ্টির খবরদারি তো আছেই। কাল্পনিক ও ভয়াবহ সেই যুগে একক পার্টির শাসনে সত্য মন্ত্রণালয়ে লেখা থাকে তিনটি অমোঘ স্লোগান:
যুদ্ধই শান্তি।
স্বাধীনতাই দাসত্ব।
অজ্ঞতাই শক্তি।
আধুনিক রাষ্ট্রক্ষমতার ভণ্ডামির বিরুদ্ধে উপন্যাসটির সর্বত্র এমন ভয়ঙ্কর অথচ সন্ত্রস্ত ব্যঙ্গের চাবুক।
এই গ্রাফিতিক ছবিটিতে দল, রাজনীতি, তার কর্মী ও সামগ্রিকভাবে জনগণকে ক্ষমতাবানদের, রাষ্ট্রের দ্বারা সর্বব্যাপী নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা বিষয়ে অরওয়েলের একরৈখিক সমালোচনার অভিমুখ বদলে দিয়েছেন শিল্পী শেপার্ড। ছবিতে বিগ ব্রাদারের একটি চোখ আর একটি কান। দুটিই খোলা। অর্থাৎ বিগ ব্রাদার তাদের 'দাদাগিরি'র খবরদারি চালু রাখে আড়চোখে নজরদারি করে এবং আড়ি পেতে শোনে— মানুষের জীবনে গোয়েন্দাগিরি করে। এই গ্রাফিতিটি স্পষ্টতই মানব ভবিতব্যের একধরনের ভয়াবহতাকে চিহ্নিত করে। শাসকের ভাবাদর্শ অনুযায়ী মানুষের মনে এই ভয় জন্মিয়ে দেওয়া হয় যে, ক্ষমতা তার বহুতর মেশিনারি দিয়ে তাদের ওপর সর্বদা নজর রাখছে। বিগ ব্রাদারের প্রচারণাটি জনসাধারণের উদ্দেশে একটি ধ্রুবক ও স্মারক হিসেবে কাজ করে। এখানে 'ওয়াচিং' শব্দটি ঘটমান বর্তমান কালের চিরন্তন ইঙ্গিত হিসেবে ধারা যেতে পারে।
.
.
.
দেয়ালের লেখা : এক অন্তহীন প্রকীর্ণ শিল্পকথা
অনন্ত জানা
প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী
মুদ্রিত মূল্য : ৫৪০ টাকা
সুপ্রকাশ
Comments
Post a Comment