দেয়ালের লেখা : এক অন্তহীন প্রকীর্ণ শিল্পকথা।। অনন্ত জানা।। সুপ্রকাশ।।
"এ এমন এক কাজ, যার কথা শিবেশ-যতীশ সুমনের কাছে শুনেছে, ছবিও দেখেছে, তার ইতিহাসও তারা মোটামুটি জানে, কিন্তু নিজেরা কখনও হাতেকলমে করেনি। সুমনও এই গঞ্জদেশে সেই ধরনের দেয়াললেখার কোনো তাগিদ অনুভব করেননি।
কিন্তু আজ তারই প্রয়োজন বোধ করলেন।
ঘরে ছিল মোটা কার্টিজের কাগজ। তাতেই সুমন এঁকে ফেললেন এই রাঢ়ীয়-বঙ্গের প্রথম গ্রাফিতিটি।
খুব সহজবোধ্য বিষয়— দু-জন ভিন্ন শ্রেণীর মানুষ— একজন অর্ধনগ্ন কঙ্কালসার একটি দেহাতি মানুষ— একেবারে নতজানু; অন্যজন ধুতি-সার্ট পরিহিত ভদ্রপানা একজন মানুষ। সকলেই দু-হাতে নিজ নিজ কর্ণধারণ করে আছেন।
প্রথমে ছবিটার ক্যাপশন হিসেবে শ্লেষাত্মক কিছু লিখবেন ভেবেছিলেন।
কিন্তু ভেবেচিন্তে তা বর্জন করলেন।
শুধু বাঁ-হাতের তর্জনিতে ন্যাকড়া-জড়িয়ে ছেলেমানুষী কাগের ঠ্যাঙ-বগের ঠ্যাঙ করে গাঢ় কালো রঙে একটিমাত্র শব্দ লিখলেন— 'অগ্রগতী'। বলাই বাহুল্য হরফের এই কদর্যতা এবং 'অগ্রগতি' বানানের ঐ বিকৃতি একেবারেই ইচ্ছাকৃত। সবুজ বয়সে সুমনের শেখা রাজনৈতিক কৌশলের প্রয়োগ। সন্দেহ হলেও প্রকাশ্যে এমন কথা বলা মুশকিল যে, সুমন বা সুমনের চ্যালারা বানান ভুল লিখেছে!
শিল্পের শক্তি ও উপভোক্তার বোধে তাঁর আস্থা তাঁকে সংগোপনে সমর বেসরার এই নির্যাতনের গ্রাফিতিটিকে সুমন মানুষদুটির চেহারা টাইলারের গ্রাফিতির মতো বিদেশী ঢংয়ের করে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে নাইফ-কাটার দিয়ে অতি দ্রুতহাতে স্টেনসিল কেটে ফেললেন। নীল আর হলুদ রঙ-মিশিয়ে অদ্ভুত এক সবুজ রঙ তৈরি করলেন। তার তলদেশ থেকে উঠে আসছে যেন ঘোর কৃষ্ণবর্ণের কোনো সপ্তশির কালীয় নাগ। ফণাতোলা শরীরে তার আজন্মকালের শৈবাল। গোকুলের পাশে সেই যমুনা নদী, যমুনার জলজ-অনুধ্যায়ের চমক নিয়ে তার ফণার বিস্তার।
তারপর আরও রাত্রির জন্য প্রতীক্ষা।
পরদিন রেলবাজারের পাশে পুরোনো ও পরিত্যক্ত গোডাউনের ক্ষয়াটে দেয়ালে আর গঞ্জের বুক-চিরে যে বাস-রাস্তাটা সোজা চলে গেছে বড়ো সদরের দিকে সেটার শেষ-প্রান্তে গঞ্জ থেকে বেরিয়ে যাবার মুখে জনবাসী প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়টি সম্প্রতি ছাত্রীসংখ্যা আর শিক্ষক-শিক্ষিকার অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে, তার বাইরের দেয়ালে এই গ্রাফিতিটি দেখে সমস্ত গঞ্জে ধীরে ধীরে কী প্রতিক্রিয়া হচ্ছিল তা জানার যাবতীয় কৌতূহল সুমনের নির্দেশে সংযমিত হলো। সুমন এতকাল সযত্নে নিজের ছবি ও সাইনবোর্ডের জগৎকে স্বাতন্ত্র্য দিয়েছিলেন। ছবির ক্ষেত্রে বিমূর্ততা তিনি আর্ট কলেজে থাকতেই বর্জন করেছিলেন। এবার গ্রাফিতির ক্ষেত্রে সেই পথই তিনি অবলম্বন করলেন এবং এমনভাবে স্টেনসিলের ছাঁচে রঙ লাগালেন এবং কাটা অংশগুলি ভরাট করে দিলেন যাতে এগুলিকে হাতে আঁকা ছবি বলে মনে হয়, কিন্তু শিবেশ-যতীশের হাতের কাজের থেকে দেখতে যেন আলোকবর্ষের দূরত্বে থাকে তার অবস্থান! স্টেনসিলের অবশেষগুলিকে সেই রাত্রেই সুধাময়ের বার-বাড়ির পুরোনো চালার খড়ের মধ্যে রেখে দেওয়া হলো তিন বৃষ্টিতেই বেচারারা খড়োমাটিতে পরিণত হবে। তারপর সেগুলো উইমেকায় নিক্ষেপ করলেই হলো!
গঞ্জে এক স্তব্ধ-কৌতূহল জেগে থাকল শুধু।
অতঃপর গঞ্জ ও তার আশপাশের গাঁ-গেরামগুলি অপেক্ষা করে থাকল মাঝে মাঝে মাটির দেয়ালে, রাস্তার পাশে রাখা ইটের পাঁজায়, ভাঙা প্রাচীরের গায়ে, রাস্তার পাশে বসার জন্য তৈরি ধাপিতে, গৃহস্থবাড়ির বারবাড়ির পরিত্যক্ত মড়াইয়ের বেড়ার অঙ্গে এমন-কী গ্রামীণ বৈদ্যুতিকীকরণের জন্য ব্যবহৃত সিমেন্টের পোলের সংকীর্ণ-পরিসরেও এমন অদ্ভুত সব ছবি দেখা দিতে লাগল। সঙ্গে অতি-সংক্ষিপ্ত ভাষ্য।
মুছে-দেওয়া আর কালিলেপে বিনষ্ট-করা গ্রাফিতিতে ভরে গেল একটি বৃহত্তর গ্রামীণ অঞ্চল!"
.
.
.
.
দেয়ালের লেখা : এক অন্তহীন প্রকীর্ণ শিল্পকথা
অনন্ত জানা
প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী
মুদ্রিত মূল্য : ৫৪০ টাকা
সুপ্রকাশ
Comments
Post a Comment