দেয়ালের লেখা : এক অন্তহীন প্রকীর্ণ শিল্পকথা।। অনন্ত জানা।। সুপ্রকাশ।।

বোধ হয় ঢাকায় গ্রাফিতিতে সুবোধ এসে পড়ায় আইজুদ্দিনের কষ্টের ইতিবৃত্তে যুক্ত হয় ভিন্নমাত্রার এক উদ্দেশ্যমূলকতা।

এই গ্রাফিতিতে সুবোধ যেন এক বিশ্বজনীন চরিত্র। সেখানে কখনও বিশ্বপ্রাণের উৎস সূর্য-রক্ষক সুবোধের হাতে খাঁচার ভেতরে সূর্য! কখনও একা সুবোধ, কখনও তার সঙ্গে একটি শিশুকন্যা। কখনও সুবোধ ছুটন্ত, কখনও গরাদের অন্তরালে বন্দী। কখনও তার ঠোঁটে তর্জনির নিষেধাজ্ঞা। প্রায় সর্বত্র ইংরেজি বানানে 'হবে কি?'— এর উদ্যত জিজ্ঞাসা। সুবোধের গ্রাফিতিগুলিতে টেক্সট ঈষৎ বৈচিত্র্যময়:
 
'সুবোধ তুই পালিয়ে যা, এখন সময় পক্ষে না।'

'সুবোধ তুমি চুপ থাক।'

'সুবোধ তুই পালিয়ে যা,/এখন সময় পক্ষে না।/মানুষ ভালোবাসতে ভুলে গেছে।'

'সুবোধ তুই পালিয়ে যা, তোর ভাগ্যে কিছু নেই'।

'সুবোধ এখন জেলে, পাপবোধ নিশ্চিন্তে বাস করছে মানুষের হৃদয়ে।'

'এখানে সাপ ভরা চাপ চাপ রুচি।/কাপ ভরা পাপ পাপ ম!/সুবোধ........তুই পালিয়ে যাহ্।'

'সুবোধ, কবে হবে ভোর?'

'সুবোধ তুই পালিয়ে যা/ভুলেও ফিরে আসিস না।'

'সুবোধ তুই ঘুরে দাঁড়া'।

'তবুও সুবোধ রাখিস সূর্য ধরে।'

'সুবোধ তুই লড়ে যা, আপোষ তোকে মানায় না।'

'সুবোধ তুই পালাস না কোথাও। তোর ভাগ্যে লড়াই লেখা।'

'সুবোধ, গণকবরে কারা?'

'খুবলে মগজ খাচ্ছে কাক/সুবোধ কি আজ নির্বাক?'

অধিকাংশ গ্রাফিতির মতো সুবোধ গ্রাফিতির শিল্পীর নামও জানা যায় না। শুধু 'হবে কি' বাক্যটি যেন শিল্পীর স্বাক্ষরের মতো সর্বত্র গ্রাফিতিক বয়ানের ধ্রুবপদ হয়ে থাকে।

ঢাকা ছাড়াও কলকাতার দেয়ালেও সুবোধকে দেখা যায়। সুবোধ চেহারায়, পোশাকে পুরোপুরি প্রান্তিক মানুষ। পারিপাট্যহীন এক মাথা ঝাঁকড়া চুল, চকিত চাহনি। সুবোধ কোনো অতিমানব নয়, কোনো নায়ক নয়, উৎপীড়িত রোমান্টিক হিরো নয়, বেতাল-অরণ্যদেব, টারজান, গার্থ বা স্পাইডারম্যানদের মতো দুষ্টের যম নয়। সুবোধ হয়তো ছিন্ন-সাধারণজনের এক নির্বল, লক্ষ্যহীন, সমকালের জটিলতাকে চিহ্নিতকরণে চিরব্যর্থ মানুষের মতো পশ্চাদপসরণ করে, কিন্তু অনাহারক্লিষ্ট বালিকাকে সান্ত্বনা দেয়। তবু এর স্রষ্টা ব্রিটিশ গ্রাফিতিশিল্পী ব্যাঙ্কসির মতো 'হবে কি' ক্যামোফ্লেজের অন্তরালে সুবোধের সঙ্গে নবারুণকে জুড়ে দেন— আশা-সূর্যকে—মানুষের আশ্চর্য সম্পদ প্রাণের উৎসটিকে সুবোধ রক্ষা করে। 'হবে কি' তো একা নন, বাংলাদেশে 'ক্রো-কাক'-এর মতো গেরিলা শিল্পীর গ্রাফিতিও আছে।

সুবোধ সম্পর্কে আমেনা শারমিনের মূল্যায়নটিকেও সাধ্যমতো গ্রাহ্য করতে হবে। সুবোধকে কেউ কেউ বাস্তু থেকে উচ্ছিন্ন, প্রতিষ্ঠা থেকে ভ্রষ্ট, সামাজিক গ্রাহ্যতার থেকে বঞ্চিত এক বিপন্ন নাগরিকসত্তা বলে মনে করেছেন। বাংলাদেশের ধারাবাহিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবমূল্যায়ন, নানাবিধ নিষেধাজ্ঞা ও ক্রমবর্ধমান সেন্সরশিপ, মুক্তিবোধের ক্ষয় ইত্যাদির মধ্যে তরুণপ্রজন্মের লক্ষ্যহীনতার 'চিরস্থায়ী ট্রমা'-র প্রতিনিধি সুবোধের চিকা মারা উপস্থিতি। সুবোধের প্রাথমিক উপস্থিতি ঢাকা শহরের শিল্প উদ্যানকে ঘিরে হওয়ায় অনেকেই মনে করেছেন যে, সুবোধ গ্রাফিতির লক্ষ্য শহরের খেটে-খাওয়া ও 'নিপীড়িত সামাজিক স্তর'-এর মানুষজন। কিন্তু সুবোধের পলায়নপর সন্ত্রস্ত মূর্তি একুশ শতকের শহুরে মধ্যবিত্তের, হোয়াইট-কলার শ্রমিকের দায়, বিশ্বায়িত বন্দোবস্তে শ্রমজীবীদের ভীতিপ্রবণতা, আপোষকামী শ্রেণীচরিত্র ভ্রষ্টতা, সমাজের গরিষ্ঠ মানুষের সংগ্রামকে নেতৃত্ব দানের ব্যর্থতা, মধ্যবিত্তের দোলাচল এবং হতাশাকে ব্যক্ত করে। শেষ পর্যন্ত সুবোধের গ্রাফিতিতে দেশের পতাকা বুকে জড়ানো ছবি দেখে তীব্র শ্লেষে লেখা হয়: 'তার ওপর সুবোধ মধ্যবিত্তের আরেকটা ব্যারাম 'দেশপ্রেম'। এই দেশরে একরকম সে ভালোবাসে, এই প্রেমরে দেখাইতেও সে ভালোবাসে। এইটা একটু দেরিতে বোঝে সুবোধ। যেহেতু সুবোধও মিডলক্লাস, তাই সে দেশে ছেড়ে যাইতে চাইলেও, তার যে দেশের প্রতি প্রেম আছে, অইটা সপ্রমাণ দেশ ছাড়তে পারলে তার মনন পরিশুদ্ধ হয়। কোন গিল্ট থাকে না মনে, গোপনে। এই না থাকার প্রমাণ স্বরূপ, সুবোধকে পতাকাও হাজির করতে হল। সেই পতাকারে জড়ায়া ধরাও দেখাইতে হইল। উপায় ছিল না আসলে। কারণ সুবোধ ততদিনে পপুলার। নানান জন নানান কথা বলতেছে। মিডিয়া কভারেজ দিচ্ছে। তার মানে, সে যাদের নজরে আসলে বাস্তবিকই জেলে ঢুকে যাইতে পারে, অই আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। ফলে দেশদ্রোহী হিসাবে হাতকড়া না পরার আগেই হাতে পতাকা নেওয়াটারে সুবোধের একটা টেকনিক্যাল এপ্রোচ হিসাবেও নেয়া যাইতে পারে।' (রাজীব দত্ত: ২০২১)
.
.
.
দেয়ালের লেখা : এক অন্তহীন প্রকীর্ণ শিল্পকথা
অনন্ত জানা 

প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী
মুদ্রিত মূল্য : ৫৪০ টাকা

সুপ্রকাশ
     


Comments

Popular posts from this blog

এক যে ছিল গ্রাম।। অর্ধেন্দুশেখর গোস্বামী।। সুপ্রকাশ।।

চেতনার পথ জুড়ে শুয়ে আছে।। অনির্বাণ সিসিফাস ভট্টাচার্য।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

প্রতিযাত্রা।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।।