দেয়ালের লেখা : এক অন্তহীন প্রকীর্ণ শিল্পকথা।। অনন্ত জানা।। সুপ্রকাশ।।

একটি কবিতার জনগ্রাহ্য হয়ে ওঠার ইতিবৃত্তকে অনুসরণ করলেই গ্রাফিতি নামক এই রাস্তার শিল্পের অমেয় শক্তি বোঝা যায়। দেয়াল থেকে দেয়ালে একটি কবিতাটির 'হয়ে ওঠার' সেই ইতিবৃত্ত রোমহর্ষকও বটে।

কবি হেলাল হাফিজ (১৯৪৮-১৯২৪)-এর সেই কবিতাটির প্রাথমিক চরণদুটি দেয়াললিপির সৌজন্যে অনেকের কাছেই— যিনি কবিতা পড়েন না আদৌ, যিনি সাম্প্রতিক বাংলা কবিতাকে বাংলা বর্ণে লেখা দুর্বোধ্য কোনো ভিন্ন ভাষার অ-বাক্য বলে মনে করেন, তেমন মানুষের কাছেও পরিচিতি পায়।

হাসান হাফিজকে দেওয়া হেলাল হাফিজের এক সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়— ছাত্রাবস্থায় কবি হেলাল হাফিজ এক বিকেলে পুরান ঢাকা থেকে রিক্সা করে ফিরছিলেন তাঁর হস্টেল ইকবাল হলে। সেটা ১৯৬৯ সাল। সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানী স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তীব্র গণআন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। ঢাকার গুলিস্তানের ফুলবেড়িয়ায় পৌঁছে হাফিজ দেখলেন সেখানে সমানে মিছিল ও বিক্ষোভ চলছে, ছাত্রজনতার সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বেঁধে গেছে। পুলিশ-মিলিটারির লাঠিচার্জের প্রতিবাদে ছাত্রদের পক্ষ থেকে ঢিল-পাটকেল ছোড়া হচ্ছে। এরই মধ্যে বয়স্ক এক রিক্সাচালক বললেন— 'মার, মার শালাদের। প্রেমের জন্য কোনো কোনো সময় মার্ডারও করা যায়।' কথাটা তরুণ হাফিজকে বিমোহিত করেছিল। ঐ কথা থেকেই 'নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়' নামে কবিতাটি লেখা হলো— 'এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।...' (যে জলে আগুন জ্বলে) কিন্তু কবিতাটি ছাপা হতে পারল না।

কবিতাটি পড়ে ভালো লাগায় কবি আহমদ ছফা (১৯৪৩-২০০১) এবং কবি হুমায়ুন কবির (১৯৪৮-১৯৭২) কবিতাটি প্রকাশের জন্য নিয়ে যান 'দৈনিক পাকিস্তান' পত্রিকার তদানীন্তন সাহিত্য সম্পাদক কবি আহসান হাবিবের কাছে। 'দৈনিক পাকিস্তান' সরকারি কাগজ হওয়ায় সেই পরিস্থিতিতে তিনি কবিতাটি ছাপার ব্যাপারে অক্ষমতা জানান। কেননা এই কবিতায় সশস্ত্র সংগ্রামকে সমর্থনের ইঙ্গিত আছে।

কবিতাটি যখন ছাপা গেলই না তখন আহমদ ছফা ও হুমায়ুন কবীর এক রাতে কবিতার প্রথম দুটি চরণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে 'চিকা মেরে' দিলেন। মাত্র দু-রাতেই গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সমস্ত দেয়াল এই রহস্যময় অথচ উদ্দীপক কাব্য-চরণে একেবার শ্লোগানের মতো ছেয়ে গেল।

যতীশ-শিবেশদের রাতবিরেতে 'দিয়াল ফাঁকানো'র থেকেও সাংঘাতিক এই 'চিকা মারা' ব্যাপারটা!

চিকা মারা মানে দেয়াল লিখন হলেও কথ্য ইঙ্গিতে এর এক গোপন অর্থ আছে, আর তা হলো রাতের অন্ধকারে সকলের চোখ এড়িয়ে নিষিদ্ধ দেয়াল লিখন। 'চিকা' অর্থে ইঁদুর বা ছুঁচো-জাতীয় প্রাণী। গভীর রাতের ভীতিকর পরিবেশে দেয়াল লিখনরত তরুণরা রাষ্ট্রীয় আইনরক্ষক বা পুলিশের নজরে পড়ে গেলে বলতেন যে, বাড়িতে চিকার উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় তাঁরা চিকা মারার জন্য লাঠি নিয়ে বাইরে এসেছেন! 'চিকা মারা' বলতে নিষিদ্ধ দেয়াল লিখনকেই বোঝানো হয়। তা চিকা মারা'র পরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে লেখা ঐ দুটিমাত্র চরণ অবিলম্বে ছাত্রদের মুখে মুখে ফিরতে লাগল। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সংগ্রামের দিনগুলিতে মানুষের উজ্জীবনের অন্যতম মন্ত্রসদৃশ হয়ে ওঠে কবিতার এই দুটি চরণ। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে এই কবিতাই ছিল ক্লান্তি অপনোদনোর উপাদান।

শুধুমাত্র গ্রাফিতায়নের জোরে একটি অপ্রকাশিত কবিতার এমন জনপ্রিয়তা!
.
.
.

দেয়ালের লেখা : এক অন্তহীন প্রকীর্ণ শিল্পকথা
অনন্ত জানা 

প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী
মুদ্রিত মূল্য : ৫৪০ টাকা

সুপ্রকাশ
     

Comments

Popular posts from this blog

এক যে ছিল গ্রাম।। অর্ধেন্দুশেখর গোস্বামী।। সুপ্রকাশ।।

চেতনার পথ জুড়ে শুয়ে আছে।। অনির্বাণ সিসিফাস ভট্টাচার্য।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

প্রতিযাত্রা।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।।