লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর।। এক বিষাদান্ত পরম্পরা।। অনন্ত জানা।। সুপ্রকাশ।।
আমাদের মতো বৃহৎ ও একান্নবর্তী পরিবারের অভিভাবকেরা-বাবা-কাকা-জ্যাঠামশাইরা দেশ-কাল-পরিস্থিতির অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব পেরিয়ে এসেছিলেন। প্রাক-স্বাধীনতাপর্বের আদর্শ ও আবেগাচ্ছন্ন রাজনীতি, সমাজনীতি ও সাংবাদিকতার জগৎ, সেকালের উদ্দীপিত সাহিত্যান্দোলনের বাঁকগুলির মধ্যে দিয়ে গেছেন তাঁরা। মন্দা, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা, খণ্ডিত স্বাধীনতা দেখেছিলেন তাঁরা এবং তার ফলাফলও প্রত্যক্ষত ভোগ করতে হয়েছিল তাঁদের।
নিজেদের প্রেস বিক্রি করে দিয়ে পরের প্রেসে ম্যানেজারির চাকরি করাটা নতুন কিছু ছিল না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'জননী' উপন্যাসে প্রেস মালিক শীতলের ভাগ্যনাশ হয়েছিল নিজের উচ্ছৃঙ্খলতার কারণে। মানিক বলেছেন শীতলের প্রেসের আয় ভালো ছিল। বন্ধুদের নিয়ে পান-ভোজনে অতিরিক্ত অর্থব্যয়ই তার ব্যবসায়িক বিপর্যয়ের কারণ। কিন্তু শ্যামা তার দ্বিতীয় স্ত্রী। শ্যামাকে বিয়ের আগে উচ্ছৃঙ্খলা কি দেখা দেয়নি? নাকি প্রেস বিক্রি করে দেওয়ার পেছনে সে-সময়ে দেখা দেওয়া পৃথিবী-জোড়া অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ভারতীয় কলোনিয়াল অনুবৃত্তির নিঃশব্দ ঘাতকের হাত ছিল না! তাই-ই যদি না হবে তবে প্রায় একই সময়ে লেখা 'পদ্মানদীর মাঝি' উপন্যাসে একইভাবে কুবেরকে নিজেদের পৈতৃক নৌকার বিনষ্টির কারণে পরের নৌকায় চার-আনা ছ-আনা ভাগে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়! লক্ষণীয়—জননী উপন্যাসে পরে বনগাঁয় এক গ্রামীণ ছাপাখানায় পনেরো টাকা বেতনে শীতলকে কাজকর্ম দেখার এবং খাতাপত্র লেখার কাজ করে যেতে হয়েছে।
বড়ো জ্যাঠামশাই যে নিজেদের প্রায়শই 'কাঙালের নাতিপুতি' বলে দাবি করতেন, তার কারণ তিনি ছিলেন কাঙাল হরিনাথের স্বগৃহীত ভাবশিষ্য। তাঁর চৌকির মাথার কাছের দেওয়ালে হরিনাথ মজুমদারের একটি ছবি টাঙানো ছিল—একটি নাতিউচ্চ জলচৌকি জাতীয় আসবাবের ওপর পাতা আসনে চাদর গায়ে উপবিষ্ট হরিনাথ। পরবর্তী সময়ে দেখেছি—এটিই হরিনাথের প্রাপ্তব্য একমাত্র ছবি। জ্যাঠামশাই বোধহয় হরিনাথের জীবনের (যে হরিনাথ নিজের অসম্ভব দারিদ্র্য নিয়েও সরকারি কর্তৃপক্ষ, ইংরেজ শাসক, নীলকর সাহেব কিংবা জমিদারের রক্তচক্ষু অথবা শারীরিকভাবে আক্রান্ত হবার আশঙ্কাকে জয় করে তাঁর গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকায় যাবতীয় অত্যাচারের প্রতিবাদ করতেন এবং অসহায় প্রজাদের হয়ে প্রতিকার দাবি করতেন) অন্তরাপন বার্তা থেকেই হাসিমুখে থাকার শক্তি পেতেন। অর্থাভাব বা অন্যান্য যে-কোনো সাংসারিক সমস্যায় হরিনাথের কবিতা উদ্ধৃত করে বড়ো জ্যাঠামশাই আমাদের পূর্বোল্লিখিত কথাটিই বলতেন—'অন্ন বিনে অঙ্গ শীর্ণ, বিবর্ণ হয়েছে বর্ণ/পরিধান ছিন্ন জীর্ণ, পরে শত গ্রন্থি দিয়ে'—আরে বাবা, আমরা হলাম গিয়ে কাঙালের নাতিপুতি আমাদের কোথাও আটকাবে না।' (কবিতাটির উল্লেখ—আবুল আহসান চৌধুরী : কাঙাল হরিনাথ মজুমদার, ঢাকা ১৯৮৮)।
আটকাবে যে না, তা বড়োমা-মেজোমাও জানতেন। কিন্তু তাঁকে আরও কতগুলো মেয়ের বিয়ে দিতে হবে, আরও কত ছেলেমেয়ের সকলের শিক্ষার খরচ সংস্থান করতে হবে, অসুখ-বিসুখে ওষুধ-পথ্য যোগাতে হবে—এসব ভেবে তিনি আর মেজো জ্যেঠিমা সর্বদা আতঙ্কিত থাকতেন।
মা অপেক্ষা করতেন বাবা কবে ডাক্তারি পাশ করবেন। বাবার মেধার ওপর মায়ের অগাধ আস্থা ছিল। মা ভাবতেন—বাবা ডাক্তারি পাশ করে কুঠিডাঙায় এসে বসলে তিনিই হবেন এখানকার প্রথম পাশ করা ডাক্তার। আর তাঁর আয় থেকেই আমাদের পরিবারের প্রাত্যহিক টানাটানির অবসান হবে। কিন্তু মায়ের আশা তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ণ হয়নি। পাশ করার পরও বাবাকে অনেক বছর পত্রিকার চাকরিটি করে যেতে হয়েছিল, কেননা কুঠিডাঙায় ফিরে এসে ডিসপেন্সারি সাজিয়ে বসার মতো অর্থ ছিল না। তাছাড়া ডাক্তারি শুরু করলেই যে পসার জমে উঠবে তেমন নিশ্চয়তাও ছিল না—চাকরি ছেড়ে দিলে সেই মধ্যবর্তী সময়ে সংসার চলবে কেমন করে! বাবা হোমিওপ্যাথিকে শ্রদ্ধা করতেন, 'মাল্টি সিস্টম্ অ্যান্ড সিঙ্গল্ ড্রাগ'-এর হোমিও-নীতিতে তাঁর পরিপূর্ণ আস্থা ছিল। কিন্তু তথাকথিত হোমিও নৈতিকতা বা মনগড়া 'হোমিও এথিক্স'-এর নামে কোনোরকম সংকীর্ণতা ছিল না তাঁর আচরণ ও সিদ্ধান্তে। সবচেয়ে বড়ো কথা হোমিও-বাস্তবতা সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন। আর্থিক ক্ষমতা, লগ্নির বিপুলতা, চিকিৎসার নামে মুনাফার বাজার খুলে বসার মতো সংগতি কিংবা নিত্য-গবেষণার মধ্যে দিয়ে আবিষ্কার-পুনরাবিষ্কারের মতো পরিকাঠামো নির্মাণের সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেও বাবা খুবই সচেতন ছিলেন। অতি যোগ্য ও কুশলী হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকও যে এই সমাজে পেশাদার হিসেবে তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক—সে-বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন তিনি। প্রেসের কম্পোজিটর বা সংবাদপত্রের সহযোগী সম্পাদক, অথবা পরবর্তীকালে চিকিৎসক হিসেবে—সব ক্ষেত্রেই তিনি নিজেকে এক-ধরনের নম্র আত্মমানিতার বর্মে সুরক্ষিত রাখতে ভালোবাসতেন। ফলে অর্থাভাব তাঁকে ও আমাদের পরিবারকে দরিদ্র করতে পারেনি।
বড়ো ও মেজো জ্যাঠামশাইয়ের আত্মবোধের একান্ত-জগৎটার নাগাল পাওয়া কিচিরমিচিরে মেতে থাকা, কোনো কিছু না-পাওয়াকে পরাজয় এবং সামান্য সাফল্যকে ঔদ্ধত্যের উপাদান করে তোলা আমাদের পক্ষে অনুধাবন করা সহজ ছিল না। বিশেষ করে অন্য-কারও প্রাপ্তিকে নিজেদের অপ্রাপ্তির বেদনার সঙ্গে একাকার করে দেখার সংকীর্ণতায় গ্রস্ত আমাদের পক্ষে সত্যিই জ্যাঠামশাইদের বা বাবার দুর্ভেদ্য সুরক্ষা বলয়টিকে লঙ্ঘন করা অসম্ভব ব্যাপার ছিল। একদা মেজো জ্যাঠামশাইয়ের পাঠসম্ভার ঘাঁটতে গিয়ে তাঁর একটি খাতা খুঁজে পাওয়ার পর আমরা, ভাইবোনেরা তাঁদের শক্তির কেন্দ্রটির আপাতভাবে কিছুটা যেন নাগাল পাই। সেটা অনেক পরের কথা-ততদিনে বড়ো ও মেজো জ্যাঠামশাইয়ের নিষ্ক্রমণ ঘটেছে।
........................................
লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর
এক বিষাদান্ত পরম্পরা
অনন্ত জানা
....................................
অলংকরণ : সুলিপ্ত মণ্ডল
প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী
মুদ্রিত মূল্য : ২৯০ টাকা
সুপ্রকাশ
Comments
Post a Comment