প্রেস, নিকট-অতীতের লেটার-প্রিন্টিংপ্রেস মানে কী? প্রেস মানে তো একটা পরিচিত সাদা-কালো ছবি! মলিন ঘরে সস্তার কাঠের টেবিল, গুটিকতক চেয়ার, বেয়াড়া মাপের টুল অথবা নাতিদীর্ঘ বেঞ্চি—এই হলো সদর ; আর অন্দরে আধো-অন্ধকার-সমাকীর্ণ একটি-দুটি ঘরে কালিমাচিহ্নিত দেওয়াল, মলিন চেহারার কয়েকটি নাতি-উচ্চ কেস-র্যাক—যেখানে ঢুকিয়ে রাখা টাইপ-কেস, ঢালওয়ালা কিন্তু চালাহীন কম্পোজ স্ট্যান্ডের ওপরে ও স্ট্যান্ড ঘিরে রক্ষিত টাইপ-ভর্তি চৌকোণা খোপওয়ালা কেসগুলো। প্রেসের আয়তন ও সামর্থ্য-অনুযায়ী এমন টাইপ-স্ট্যান্ডের সংখ্যা, প্রত্যেকটি স্ট্যান্ডের সামনে কাঠের টুল। লেটার-প্রিন্টিংপ্রেসের এক প্রতিনিধি স্থানীয় চিত্রের সঙ্গে সঙ্গে এই বই বিশেষভাবে ছাপাখানার সেই তাঁদের কথা, যাঁদের হাতের বিন্যস্ত অক্ষর টেলিগ্রাফের মতো সংকেতে-ইশারায়-ইঙ্গিতে মূর্ত সৌধ রচনা করে এসেছে দীর্ঘকাল। এই বই সেই ঘরের কাছের উপেক্ষার দ্বীপান্তে নির্বাসিত জগৎটির ছবিটিকে সময়ের কুয়াশাচ্ছন্ন অরক্ষিত সংগ্রহশালা থেকে পুনঃসংগ্রহের একটা প্রচেষ্টা বলা যায়। এই অপরিসর, আলো-বাতাসের কার্পণ্যে মুহ্যমান জগতের শ্রমসাধ্য-ভ্রাতৃত্বের গল্প প্রায় উপকথা হয়ে আলো ছড়ায়। সেই আলো...
বাগবাজারের খালধারে ছিল আমাদের বাসাবাড়ি। আমরা পাঁচ ঘর ভাড়াটে ছিলাম। একতলায় ছিল একটিমাত্র কলঘর। সিঁড়ির কোনায় ঘুঁটের ঝুড়ি রাখা দিয়ে শিখার মা-র সঙ্গে নিয়ে আমার মায়ের ঝগড়া হতো মনে পড়ে। একদিন আমার বোন 'আমার সোনার হরিণ চাই' গান গাইছিল। ও যেমন পারত আর কী ! আর শিখা চেঁচামেচি শুরু করে দিল। 'লজ্জা করে না, আমাদের গান গাইছিস, আমাদের গান একদম গাইবি না।' শিখার বাবা ছিলেন গানের মাস্টার। শাড়ি-পরা বড় বড় মেয়েরা সব গান শিখতে আসত। আমার মায়ের একটা জার্মান রিডের হারমোনিয়াম ছিল। বাবা টিউশানি সেরে যেদিন ফিরতে দেরি করতেন, মা হারমোনিয়াম নিয়ে বসতেন। একদিন মা 'আমার সোনার হরিণ চাই' গাইছিলেন। আমি আঙুলটা ঠোঁটের সামনে ধরে বলেছিলাম, 'চুপ, চুপ, এটা গেও না এটা গেও না, এটা শিখাদের'। মা দ্রুত ঘাড় কাত করে বলেছিলেন, 'ইঃ, আহ্লাদ ! ওদের গান ? রবীন্দ্রনাথের গান। রবীন্দ্রনাথ সবার।' তখন শুক্রবার শুক্রবার রেডিও-নাটক শোনার চল ছিল। একদিন স্কুলে গিয়ে শুনলাম 'ডাকঘর' হবে। আমাদের রেডিও ছিল না, শিখাদের ছিল। শিখাদের ঘরে এ-বাড়ি ও-বাড়ি থেকে বউ-ঝিরা কোলে করে শুক্রবার আটটা বাজতে পাঁচ...
ভৈরব প্রাচীন নদী। কিন্তু এমন বাঁক বোধ হয় বঙ্গের কোনো নদীতে নাই। নদীপথে যাইতে যাইতে নদীকূলে দুই একটি বটগাছ দেখিতে পাওয়া যায়, নদীর বাঁক ঘুরিয়া সেই বটতলায় আসিতে সমস্ত দিন লাগে, এরূপও দেখা গিয়াছে। একে মূল নদী পদ্মা জলাভাবে এই শাখায় যথেষ্ট জলধারা ঢালিয়া দিতে পারে না, তাহার ওপর এই রকম বাঁক, সুতরাং বৎসরের অন্যান্য ঋতুতে নদীতে জল থাকে না। কোথাও এক গলা, কোথাও এক বুক জল থাকে, তাহাও শৈবালদাম-সমাচ্ছন্ন। স্রোতের অভাবে নদীর অধিকাংশ স্থলই মজিয়া গিয়াছে। কৃষকেরা জলের ধার পর্যন্ত হল-চালনা করিয়া শস্য বপন করে, সেই জন্য নদী আরও অধিক ভরাট হইয়া উঠিয়াছে ; তাই শীর্ণকায়া অগভীর বক্রগামিনী স্রোতহীনা নদীর অবস্থা দেখিলে নিকটবর্তী পল্লীবাসীগণের চক্ষুতে জল আসে। দুই শত মণ বোঝাই নৌকাও নদীপথে চলিতে পারে না, স্থূল শৈবাল বা টোপা পানার স্তূপ ভেদ করিয়া পল্লীবাসীগণ নদীপথে নৌকারোহণে গ্রামান্তরেও যাইতে পারে না; শৈবালদলে দাঁড় বাধিয়া যায়, পালেও নৌকা চলে না। বন্ধনদী ম্যালেরিয়া ও মশকের আশ্রয়দুর্গে পরিণত হইয়াছে। বর্ষাকালে কোনো কোনো বার নদীতে অল্প জল আসে, তখন নদীবক্ষ যৎসামান্য স্ফীত হইয়া ওঠে মাত্র, তাহাতে নদীবক...
Comments
Post a Comment