Posts

রান্নাঘরের গল্প।। মহুয়া বৈদ্য।। সুপ্রকাশ।।

Image
"দু-কাঠা জায়গা, সেখানে বাড়ি হবে। আমাদের চাই বিশাল একটা লিভিং-রুম, যেখানে চাইলে ছেলেরা ক্রিকেট খেলবে আর মাঝেসাঝে আমাদের ঘরে গান-কবিতার আসর বসবে। আমার চাই বড়ো একটা রান্নাঘর আর আমার প্রাক্তনের দাবি ছিল, যা-ই হয়ে যাক, গ্যারেজ রাখতে হবেই, তিনি গাড়ি কিনবেন। এইটুকু জায়গা আর এত বড়ো স্বপ্ন! 'গোরুটা একপোয়া দুধ দিয়েছে, উপেন খাবে বিপিন খাবে তাকে একটু দিতে হবে/ নন্দলাল কোলের ছেলে তাকে একটু দিতে হবে/ আমার আবার পোড়া মুখে দই না হলে রোচে না তাকে একটু দিতে হবে...!' সব্বাইকে দিতে হবে। আমাদের প্ল্যান নিয়ে যে প্ল্যানারের কাছে যাই, তাঁরাই হাল ছেড়ে দেন বা যাহোক একটা প্ল্যান গছিয়ে দ্যান, যাতে এইটুকু রান্নাঘর, একটা সোফা রাখার মতো লিভিং-রুম—  খালি তাঁরা কায়দা করে একটা বড়ো গ্যারেজ বিভিন্ন দিকে বার করে প্ল্যান দেখাতে লাগলেন। তখন আর কী করা, নিজেকেই মাঠে নামতে হলো। 'হোমস অ্যান্ড গার্ডেন' বা 'হাউস অ্যান্ড গার্ডেন' এমনি কোনো নামে একটি পত্রিকায় তখন বিশাল-বিশাল বড়োলোক মানুষদের বাড়ির প্ল্যান ছাপা হতো। কলেজ স্ট্রিটের পুরোনো দোকান থেকে কিনে আনা সেই সব পত্রিকায় আমার বইয়ের তাক ভরে উঠল। কিছুতেই আ...

রান্নাঘরের গল্প।। মহুয়া বৈদ্য।। সুপ্রকাশ।।

Image
"মেজোনানার ছয় ছেলের সঙ্গে এক মেয়েও ছিল। তার ডাকনাম ছিল বাম্পো। এই বাম্পোপিসির সঙ্গে আমার মায়ের খুব গলায়-গলায় ভাব ছিল। বাপের বাড়ি এলেই, সে 'ও আরতিদি' বলে মায়ের সঙ্গে এক ঝুড়ি গল্প নিয়ে বসে যেত। এই বাম্পোপিসির ছেলে দীপু ছিল আমার বয়সি। তার মুসলমানি মেজোনানার বাড়িতেই হলো। ঘরোয়া অনুষ্ঠান। কিন্তু কাজিসাহেবদের বাড়িতে চার ভাইয়ের পরিবার মিলে প্রায় আশি-নব্বইজনের রান্না। সেদিন দেখলাম, কাজিসাহেবদের পারিবারিক বাসন রাখার ঘর থেকে বেরোল এই অ্যাতো বড়ো-বড়ো পিতলের নকশাকাটা হাঁড়ি, তিন-চারটে। এই অ্যাত্তো বড়ো কড়াই, গামলা, খুন্তি, ঝাঁঝরি— সব পিতলের। আমার মনে হলো যেন আলিবাবার রান্নাঘর থেকে জিনিসপত্র কী করে এখানে চলে এসেছে। অমন সুন্দর নকশাদার হাঁড়িকুড়ি আমি আর কোথাও দেখিনি। উঠোনের মাঝখানে একটা বিশাল শামিয়ানা টাঙিয়ে রাঁধাবাড়ার জোগাড় চলতে লাগল। এই প্রথম আমি বিরিয়ানি নামক খাবারের নাম শুনলাম। অবাক হয়ে আরও দেখলাম, আজ সদ্য তৈরি উনুনে কড়াই বসিয়ে তাতে খুন্তি নাড়ছেন স্বয়ং মেজোনানা। সেদিন হেঁশেল থেকে তিনি মেয়েদের ছুটি দিয়ে দিলেন। ছয় ছেলেকে নিয়ে কী তরিবত করেই না তিনি রেঁধে ফেললেন অসামান্য বিরিয়ানি, স্বাদে-গন্ধ...

রান্নাঘরের গল্প।। মহুয়া বৈদ্য।। সুপ্রকাশ।।

Image
"সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে যখন এই যৌথ রান্নাঘরের হাঁড়ি আলাদা হলো, তখনো নববর্ষ-রান্নাপুজো-বিজয়া এমন সব পর্বদিনে সবাই একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করেছি। ছোটোমামা অবশ্য এই সময়ে অন্যত্র বাড়ি করে চলে যান। ফুলমামা তো বরাবর বাইরে থাকতেন। তবু বচ্ছরকার দিনে, বিশেষত পয়লা বৈশাখ, আমরা সবাই একসঙ্গে হয়েছি। খুব মনে পড়ে, নববর্ষের দিন ভোরবেলা পুকুরে জাল পড়ত। এত-এত মাছ উঠত। মামিরা সবাই মিলে একসঙ্গে হইহই করে সেই মাছ কুটতে বসে যেতেন। মামারা সব দিলখোলা হয়ে বাজার করছেন সেদিন। কেউ আনলেন খাসি তো কেউ চিংড়ি। কেউ মনে করে কুমড়ো ফুল কিনলেন ছোটোবোনের জন্য তো কেউ আবার বাগান ঘুরে খুঁজে-খুঁজে কেটে আনলেন পুরুষ্টু এঁচোড়— মেজোবোনটা যে এঁচোড়-চিংড়ি খেতে বড়ো ভালোবাসে! বাড়ির একটু বড়ো দাদারা নিমগাছ থেকে আঁকশি দিয়ে নিমপাতা পেড়ে ফেলছে। রান্নাঘরের পাশের জমিতে লংকা গাছের পাশে কয়েকটি হলুদ গাছ টেনে তুলল টুসি। নিমপাতা আর হলুদ পুকুরজলে কষকষে করে ধুয়ে ঝুড়িতে তুলে রাখলেন সেজোমামি। ওগুলি বেটে সরষের তেল-সহ গায়ে মাখতে হবে আজ। আমি ঝুনুদিদির সঙ্গে ঘুরে ঘুরে টুকটুক করে সংগ্রহ করলাম পাঁচ রকমের ফোটা ফুল আর পাঁচটি গাছের পাতা। এর সঙ্গে সোনা-রুপো মিলিয়ে শাঁখ...

রান্নাঘরের গল্প।। মহুয়া বৈদ্য।। সুপ্রকাশ।।

Image
"জ্ঞান হওয়া ইস্তক মায়ের যে রান্নাঘর দেখেছি, সেটি এখনকার যে রান্নাঘরের ধারণা, তার সঙ্গে একেবারেই যায় না। বাসাবাড়িতে আমাদের শোবার ঘরে ছিল একটা তক্তপোশ, সেটা ইট দিয়ে অ্যাত্তোখানি উঁচু করা। তার নীচে গোটা-চারেক ট্রাঙ্ক, তাতে জামাকাপড়, বইপত্তর। আর শোবার ঘরের সামনে একটা খোলার টালি দেওয়া বড়ো জায়গা, যার আদ্দেকটায় সিমেন্টের মেঝে, আদ্দেকটা মাটি। সেখানে জানালা ছিল দুটো- কাঠের ফ্রেম, কাঠের দাঁড়া (এবং কপাট), যা আজকাল প্রায় দেখাই যায় না। সস্তার জানালা, রাসের মেলা থেকে কেনা, ঘুণ ধরা থেকে বাঁচাতে তাতে দেওয়া ছিল কালো আলকাতরার পোঁচ। এইখানেই আমার মায়ের রান্নাঘর, এইখানেই আমাদের আসন পেতে খাওয়া- আজকের ভাষায় যারে বলে 'কিচেন-কাম-ডাইনিং'। এই রান্নাঘরের প্রাণ ছিল একটা এই অ্যাত্তো বড়ো কাঠের লম্বা আলমারি, যার পিছনটা কাচ দেওয়া। আজকাল মিষ্টির দোকানে যেমন শোকেস থাকে, জিনিসটা অনেকটা সেই রকম ছিল। মানে কাচের দিকটাই সামনে থাকার কথা, মা সেটাকে নিজের প্রয়োজনমতো ব্যবহার করছিলেন। মায়ের কাছে শুনেছিলাম, বিয়ের পর আমাদের দেশের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে বারান্দার এক কোণে অতি অবহেলায় মা এটাকে পড়ে থাকতে দেখেছিলেন। দিদিশাশুড়িক...

রান্নাঘরের গল্প।। মহুয়া বৈদ্য।। সুপ্রকাশ।।

Image
#সুপ্রকাশ_প্রকাশিতব্য এক বালিকার ছোটো থেকে বড়ো হয়ে ওঠার জীবন-সংগ্রামের সঙ্গে সম্পৃক্ত তার রান্নাঘর আর রান্নার গল্প। সেই গল্পেই সেজে উঠেছে এই বই। রান্নাঘরের গল্প  মহুয়া বৈদ্য প্রচ্ছদ ও অলংকরণ : অদ্বয় দত্ত মুদ্রিত মূল্য : ২০০ টাকা সুপ্রকাশ কলকাতা বইমেলায় স্টল : ৫০৩

অনন্যবর্তী।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া

Image
সুপ্রকাশ প্রকাশিত দুর্লভ সূত্রধরের উপন্যাস 'অনন্যবর্তী' পড়ে গুডরিডস্-এ মতামত জানিয়েছেন অমিয় সৌরভ দাস। আমরা নিজেদের টাইমলাইন থেকে শেয়ার করছি। ......................................................... একটা গ্রাম গ্রাম শহর। চারজন প্রৌঢ়। একদল কিশোর কিশোরী। একটা স্কুল। আর কুন্তী নদী। আর একরাশ মুগ্ধতা, ভালোবাসা। এক সুতোয় বাঁধা কয়েকটা মানুষের জীবনে কিছু অপ্রাপ্তি, আক্ষেপ আর ভরসা হয়ে ওঠা অদ্ভুত আত্মিক টান নিয়ে নির্মেদ, খুব সাধারণভাবে বলে যাওয়া জীবনের গল্প অনন্যবর্তী। পরিবারের প্রতি অভিমান করে জমিদারি ছেড়ে অনেক দূরের শহরে এসে জীবন শুরু করা, চাকরির পাশাপাশি রাত জেগে পড়াশোনা করা, সংসারের হাল ধরা এক মোক্তার সতীশচন্দ্রের গল্প এটা। শহরে দ্বিতীয় স্ত্রী, আর দুই ছেলে-মেয়ে রেখে দূর দেশে আধুনিক চিন্তাধারার এক চাকুরে শচীপ্রসাদেরও গল্প এটা। আরও একজনের গল্প— সবার বিপদে-আপদে সবার আগে ঝাঁপিয়ে পড়া দরিদ্র প্রৌঢ় ফণীভূষণ আর তাঁদের বন্ধু প্রকৃতিপ্রেমী নীরদ। কেউ দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন, কেউ ছেলে বউমার দূরে চলে যাওয়ার কষ্ট ভুলতে রক্তের সম্পর্কহীন মানুষের সঙ্গে আত্মার আত্মীয়দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছেন। ক...

দেয়ালের লেখা : এক অন্তহীন প্রকীর্ণ শিল্পকথা।। অনন্ত জানা।। সুপ্রকাশ

Image
তীব্র রাজনৈতিক অভিঘাতই যে গ্রাফিতি উৎসমুখ খুলে দেয় তার আরও এক বড়ো প্রমাণ পাওয়া যায় গৃহযুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায়।  এই গৃহযুদ্ধের যৌক্তিকতা, ন্যায্যতা, ঔচিত্য-অনৌচিত্য বিষয়ে তর্ক ও আলোচনা চলতেই পারে, কেননা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধও ছিল তথাকথিত ‘আরব বসন্ত’-এর অন্তর্গত। ২০১০ সাল থেকে পাকিয়ে ওঠা ‘আরব বসন্ত’ আরবীয় দেশগুলিতে স্বৈরশাসনের অবসান ঘটায়, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোভুক্ত ইউরোপীয় দেশগুলির পরোক্ষ সমর্থন ও প্রত্যক্ষ সক্রিয় সহযোগিতা এবং পশ্চিমী সংবাদমাধ্যমগুলির একতরফা প্রচারের মাধ্যমে ফেনিয়ে তোলা এই বসন্ত আরব দুনিয়ার দেশে দেশে একনায়কতন্ত্রী শাসন (যেমন : তিউনিসিয়ার শাসক জেন এল আবেদিন বেন আলি, মিশরের প্রেসিডেন্ট হোসনে মোবারক, লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার গদ্দাফি, ইয়েমেনর রাষ্ট্রপতি আলি আবদুল্লাহ সালেহ প্রমুখ শাসকেরা), ভয়াবহ বেকারি, অর্থনৈতিক দুর্বলতা ও দারিদ্র্য, গণতান্ত্রিকতার প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থান, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এই সমস্ত প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত মরীচীকায় পরিণত হয়। পশ্চিমী পুঁজিবাদের প্রতিপত্তির সূচনা হয় আরব দুনিয়ায়। বিপ্লবের নামেও যে মানব-ইতিহাসের বিকল্প-...