Posts

জনবিলাসের বারোমাস্যা।। সমরেন্দ্র মণ্ডল।। সুপ্রকাশ।।

Image
বিলাস চলেছে আবাসিক বিদ্যালয়ে। মিশনারি বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয় সম্পর্কে তার পূর্ব ধারণা নেই। না থাকাটাই স্বাভাবিক। তার হাফপ্যান্টের বয়সে এবং যে কিনা প্রকৃতির ভিতর লিপ্ত ছিল, তার পক্ষে শহুরে বিদ্যালয় সম্পর্কে না জানাটাই স্বাভবিক। পিতৃদেবের মুখনিঃসৃত সংবাদে মাতৃদেবী যে ধারণা অর্জন করেছিলেন এবং উপদেশের ছলে তিনি বিলাসকে যা বলেছিলেন, তা থেকে তার বোধ তৈরি হয়েছে সাদা চামড়ার আলখাল্লা পরিহিত মিশনারিরা এই বিদ্যালয়ের পরিচালক। সেখানে অনেক বালক বাস করে। বিরাট বিরাট অট্টালিকা। বিদ্যালয় এবং আবাসন একটি প্রাচীর ঘেরা জায়গায় অবস্থিত। কঠোর নিয়মের নিগড়ে তাদের বাস করতে হয়। সবই চলে নিয়মমতে। সে চলেছে ট্রেনে চেপে। এর আগে বহরমপুর যাওয়ার জন্য সে ট্রেনে চেপেছিল, কিন্তু সেই স্মৃতি অনেকটা ধূসর হয়ে গিয়েছে। এবারের স্মৃতিটা হবে নতুন। ফলে সে কিছুটা উত্তেজিত। আরেকটা কারণেও সে কৌতূহলী, সেবার ট্রেন গিয়েছিল উত্তরমুখী, এবার দক্ষিণমুখী। ট্রেনের একটা খোপে তারা উঠল। সে ছুটে গিয়ে জানলার ধারে বসল। পিঠে হেলান দেওয়া কাঠের বেঞ্চি, ফাঁক ফাঁক করা। পিতৃদেব বললেন, দাঁড়া, কাপড়টা পেতে দিই। সে উঠে দাঁড়াল। পিতৃদেব ঝোলা থেকে মায়ের একটি ছিন্ন শ...

কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্টের 'রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল'।। অনুবাদ ও টীকা : অর্ণব রায়।। সুপ্রকাশ

Image
শহরের ইউরোপীয় অংশ ছাড়িয়ে আর উত্তরদিকে নদীবন্দরের মুখে জড়ো হওয়া অসংখ্য মালবাহী দেশীয় নৌকার ভিড় পার করলে প্রথম যে জিনিসটা চোখে পড়বে সেটা একটা ভাঙাচোরা দেখতে চতুষ্কোণ চত্বর, নদীর দিকে খোলা মুখ, বাকি দিকগুলোয় প্রাচীর দেওয়া। এই প্রাচীরের গায়ে বিরাট মাঠ। আর এই মাঠেই এক কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ী কিছু সাফাই আধিকারিককে সঙ্গে করে কলকাতা শহরের মৃত চতুষ্পদদের নিয়ে তার সুচারু কাজকারবার চালিয়ে থাকে। আর ওই প্রাচীরের ওপর সারাক্ষণ গোটা পঞ্চাশেক ক্ষুধার্ত শকুন হাঁ করে বসে থাকে। আর নীচে, আবর্জনা আর হাড়ের স্তূপের মধ্যে ঘুরে বেড়ায় একই রকম ক্ষুধার্ত জঘন্য দেখতে কিছু রাস্তার কুকুর। তাদের সাথে ওই ময়লা ঘেঁটে পাওয়া পুরস্কার নিয়ে কাড়াকাড়ি করে গোটা কুড়ি দৈত্যাকার সারস।     এই বাড়িটাকে   শ্মশানঘাট বলে। হিন্দুরা এই জায়গাটা ঘিরে দিয়ে অন্য জায়গার থেকে আলাদা করে রাখে তাদের মৃতদের দাহ করার জন্য। যখন আমি ‘হিন্দুরা’ বলছি, তখন বুঝতে হবে আমি বলতে চাইছি, যাদের মৃতদেহ দাহ করার ক্ষমতা আছে, তারা। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে, হিন্দু সমাজের অর্ধেকের বেশি মানুষ এই ক্ষমতা রাখে না। আর তোমরা ভালো করেই জানো, দু একটি ব্...

কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্টের 'রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল'।। অনুবাদ ও টীকা : অর্ণব রায়।। সুপ্রকাশ।।

Image
যাত্রা শুরুর কথা বলতে গেলে আমাদের চলে যেতে হবে ঘাটে, যেখানে সমস্ত নৌকাগুলো এসে জড়ো হয়। আর কোন ঘাটে নৌকার সমাগম সবচেয়ে বেশি হয়, তা খুঁজতে গেলে আমাদের প্রথমেই যে ঘাটের কথা মনে আসবে সেটা হল বাবুঘাট। ঘাট বলতে কিছুই না, কয়েক ধাপ সিঁড়ি জলের দিকে নেমে গেছে। তার ওপরে একটা অনেকগুলো থামওয়ালা চাতালের মতো ঢাকা দেওয়া এলাকা। যে দেশীয় ভদ্রলোক এটি তৈরি করেছেন, থামের গায়ে তার নাম খোদাই করা। পাশেই একটা বিশাল অশ্বত্থ গাছ অনেকটা এলাকা জুড়ে ছাতা ধরে আছে। পুণ্যবতী হিন্দু মহিলাদের গঙ্গাস্নান সেরে উঠে আসার সময় হাতের তামার লোটা করে জল এনে এই অশ্বত্থ গাছের গোড়ায় দিতে দেখা যায়। তামার লোটা সবসময় তাদের হাতে থাকে।  . . কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্টের 'রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল' অনুবাদ ও টীকা : অর্ণব রায় . প্রচ্ছদ : অজন্তা হাজরা মুদ্রিত মূল্য : ৫৫০ টাকা সুপ্রকাশ

আহাম্মকের খুদকুড়ো।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া

Image
সুপ্রকাশ প্রকাশিত দুর্লভ সূত্রধরের বই 'আহাম্মকের খুদকুড়ো' পড়ে গুডরিডস্-এ মতামত জানিয়েছেন পৌলমী ঘোষ। আমরা নিজেদের টাইমলাইন থেকে শেয়ার করছি।  .......................................................... দুর্লভ সূত্রধরের লেখার সঙ্গে আমার দ্বিতীয় পরিচয় আহাম্মকের খুদকুড়ো। 'অনন্যবর্তী' পড়ে তাঁর লেখার যে সহজ-সরল অথচ গভীর স্বরটির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, এই বইয়ে এসে সেই স্বরটাকেই যেন আরও ব্যক্তিগত, আরও অন্তরঙ্গভাবে পেলাম। এটি আসলে কোনো সাজানো-গোছানো আত্মজীবনী নয়। বরং জীবনের এদিক-ওদিক ছড়িয়ে থাকা কিছু টুকরো স্মৃতি-শৈশব, স্কুল, শিক্ষক, বন্ধু, বাড়ির মানুষ, পাড়া, উৎসব, খাবার, অভাব, আনন্দ, ছোট ছোট বিস্ময় আর সময়ের বদলে যাওয়া। লেখক নিজেই যেন সেইসব স্মৃতির খুদকুড়ো কুড়িয়ে এনে আমাদের সামনে সাজিয়ে দিয়েছেন। আর আশ্চর্যের বিষয়, যেগুলোকে জীবনের সামান্যতম ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায়, লেখকের হাতে সেগুলোই হয়ে উঠেছে এক একটি সম্পূর্ণ গল্প। এই বই পড়তে পড়তে আমার বারবার মনে হয়েছে— মানুষের জীবনে আসলে বড় ঘটনা যতটা না থেকে যায়, তার চেয়ে অনেক বেশি থেকে যায় ছোট ছোট মুহূর্ত। জ্বরের দিনে মায়ের হাতে পাওয়া কোনো...

লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর : এক বিষাদান্ত পরম্পরা ।। অনন্ত জানা।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

Image
সুপ্রকাশ প্রকাশিত অনন্ত জানার বই 'লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর : এক বিষাদান্ত পরম্পরা' পড়ে মতামত জানিয়েছেন সৌরজিৎ বসাক। আমরা তাঁর অনুমতি নিয়ে নিজেদের টাইমলাইন থেকে শেয়ার করছি। ..................................................... পাঠ প্রতিক্রিয়া— ➤ বই :  লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর : এক বিষাদান্ত পরম্পরা  ➤ লেখক : অনন্ত জানা ➤ প্রকাশক : সুপ্রকাশ   ➤ মুদ্রিত মূল্য : ২৯০ টাকা ➤ প্রচ্ছদ শিল্পী : সৌজন্য চক্রবর্তী  ➤ অলংকরণ শিল্পী : সুলিপ্ত মণ্ডল  পাঠক-জীবনের মুসাফিরনামায় এই যে এতশত শব্দের সমুদ্রের (নিদেনপক্ষে স্রোতস্বিনী নদী তো বটেই) মধ্যে দিয়ে বৈঠা বেয়ে এগিয়ে চলতে হয়, সেটির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ‘বই’ নামক ‘দুই-মলাটে-বন্দি’ সত্তার বোধকরি দু’রকমের আত্মপ্রকাশ। তার মধ্যে প্রথমটা তো সুপরিচিত লেখক-পাঠক যুগলবন্দি, কিংবা একটি গ্রন্থ যা বলতে চায়, শোনাতে চায়। কিন্তু এরপর দ্বিতীয় যে বিষয়, যা কিনা অনেকটাই অব্যক্ত — অর্থাৎ, কাগজ-কালির কাঁচামাল হতে সম্পূর্ণ গ্রন্থে উত্তরণের যে যাত্রা, সেই শেষ-হতে-না-চাওয়া যাত্রার অভিযাত্রীদের নিজস্ব ইতিকথা।  প্রাসঙ্গিকতার খাতিরে আমরা...

উত্তরেই যায় চিঠি।। কৌশিক ঘোষ।। সুপ্রকাশ।।

Image
বাগানের দিকে যেতেই এককোণে নয়নতারা গাছটার দিকে চোখ পড়ে তার, যেটা সেই এক বৃষ্টির দিন ভিজতে ভিজতে তারিক খালপাড় থেকে এনে এখানে পুঁতেছিল। উচ্চতা কোমর অবধি বড়জোর, কয়েকটা বেগুনি ফুল ফুটে আছে। কুলগাছে অনেক কুল, কিছু কুল পেকেছে, কেউ বিশেষ আসেনি এবার। লেবুগাছ, কুলগাছ, কুয়া, সবজির খেত, দুদিকের নারকেল, পেয়ারাগাছ ফেলে এগিয়ে যায় নবা পুকুরের দিকে। পরিধি বরাবর গোল হয়ে হেঁটে বেড়ার ওপারে নো ম্যানস ল্যান্ডের দিকে একবার তাকায়। এই জায়গাটা আশ্চর্য, একই রকম অন্ধকার, ছায়াময় মনে হয় এইদিক থেকে। দূরে ক্ষীণ রাস্তার আড়ালে বেলগাছটা অবধি দৃষ্টি যায়। ওদিকে যে কোনো রাস্তা আছে, এখান থেকে টের পাওয়া যায় না।       ঘাটে ফিরে আসে সে, ওপরের পাদানিতে বসে। তারিক কবে আসবে বলতে পারল না মানিক। কোথায় গেছে, রাণীগঞ্জ, পিনকোড কত? তারিককে ঠিকানা জোগাড় করে চিঠি লিখে চমকে দেবে সে?  তারিক কি উত্তর দেবে? ঘাটের দিকে ধাপগুলো ডুবে গেছে ফের, দুটো আঁকাবাকা আনাড়ি হাতের লেখার দুটো নাম তৃতীয় ধাপে আছে, সে জানে, আবার জাগবে আগামী গ্রীষ্মে, যখন জল টানতে টানতে চৌচির হয়ে যাবে মাটি। হঠাৎ তার চোখে ভেসে ওঠে ...

উত্তরেই যায় চিঠি।। কৌশিক ঘোষ।। সুপ্রকাশ।।

Image
সন্তুদার  শেষ চিঠি এসেছিল দিন পনেরো আগে। ওর কলকাতার বন্ধুরা বেড়াতে চায় এখানে, নিয়ে আসবে, চিঠিতে লিখেছিল। কলেজ স্ট্রিট, টবিন রোড, এইসব জায়গার কথা থাকে। নবা একবারই কলকাতা গেছিল। নিমাই পার্টির একটা জমায়েতে নিয়ে গেছিল তাকে আর রাণীকে, তখন নবার ক্লাস এইট। ট্রেন ছুটছে কোলাঘাট ব্রিজের ওপরে, ঝম ঝম শব্দ, তারপর ট্রেনটা একটা জায়গায় বাঁক নিয়েছিল, পথ ফুরাতেই চায় না আর। সে ট্রেনের জানলা থেকে বিস্ময়ে দেখেছিল পাওয়ার প্ল্যান্টের গা থেকে কুয়াশার মত কী যেন উঠছে, ঠিক ধোঁয়া নয়, যেন মেঘ, নাকি ঘনকুয়াশা, উড়ে যাচ্ছে। দুদিকের কত জনপদ আর কত স্টেশন পার করে শেষে ট্রেন থেমেছিল। হাওড়া স্টেশন থেকে মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে একটা জায়গায় মিছিল এসে দাঁড়িয়েছিল, ওফফ এত লোক সেখানে... আর চতুর্দিক থেকে বাস, গাড়ি—নবার ভয় হচ্ছিল, সে নিমাইয়ের কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করছিল আপ্রাণ। সেই মিটিংয়ে অনেক নেতা এসেছিল, নিমাই নাম বলছিল, দেখাচ্ছিল তাকে আর রাণীকে, সেসব নাম তার আর সব ভাল করে মনে নেই। একসময় নিমাই বলল, রাণী, ওই দ্যাখ, মৃণাল সেন। নবা দেখেছিল, মৃণাল সেনের জুলফির কাছটা খড়ির মত ঘষা। একটাই সিনেমা সে দেখেছিল মৃ...